৫০ টন খাবার আর ১ টন মানুষ: জীবনের অস্বস্তিকর গণিত
আমরা মানুষ নিজেদের খুব গুরুত্বপূর্ণ ভাবি। ইতিহাস, ধর্ম, রাষ্ট্র, আদর্শ—সবকিছুতেই মানুষ নিজেকে কেন্দ্র বানিয়েছে। কিন্তু মানুষকে যদি অনুভূতির বদলে সংখ্যা, জীববিজ্ঞান আর শক্তির সূত্র দিয়ে দেখা হয়, তাহলে ছবিটা অনেক কম রোমান্টিক হয়ে যায়। তখন মানুষ আর কোনো “বিশেষ সৃষ্টি” থাকে না, বরং শক্তির একটি অস্থায়ী ও সংগঠিত রূপে পরিণত হয়।
একজন গড় মানুষ দিনে প্রায় ২ কেজি করে খাবার খায়। গড় আয়ু ৭০ বছর ধরলে, একজন মানুষ তার পুরো জীবনে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ টন খাবার গ্রহণ করে। প্রশ্নটা হলো—এই বিপুল খাবার খেয়ে আমরা আসলে কী তৈরি করি? উত্তরটা অস্বস্তিকর। মানুষের শরীর কোনো স্থির বস্তু না; এটা একটা চলমান জৈবিক কারখানা। প্রতিদিন আমাদের শরীরে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ বিলিয়ন কোষ মারা যায়। ওজন হিসেবে প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ১০০ গ্রাম মৃত কোষ তৈরি হয়। এই হিসাবে একজন মানুষ সারাজীবনে প্রায় ১ থেকে ২ টন নিজের শরীর হারায়।
অর্থাৎ, আমরা ৫০ টনের বেশি খাবার খেয়ে শেষ পর্যন্ত খুব অল্প পরিমাণে নিজেকে গড়ে তুলি। বাকিটা তাপ, মল, মূত্র আর কার্বন ডাই অক্সাইড হয়ে পরিবেশে ছড়িয়ে যায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে জীবন আর মৃত্যু আলাদা ঘটনা নয়। জীবন মানে হলো মৃত্যু ধীরে ধীরে ঘটানো। আমরা প্রতিদিন একটু একটু করে বাঁচি, আর প্রতিদিনই একটু একটু করে মরি।
তাহলে প্রশ্ন আসে—যদি শেষ পর্যন্ত সবকিছু মিশে যায়, তাহলে মানুষ প্রতিদিন এত কাজ করে কেন? বিজ্ঞান এখানে নৈতিক উত্তর দেয় না, যান্ত্রিক উত্তর দেয়। জীবন হলো low entropy system। এই শৃঙ্খলা ধরে রাখতে হলে শক্তি খরচ করতেই হবে। কাজ না করলে শরীর ভেঙে পড়ে, মস্তিষ্ক অস্থির হয়, আর সিস্টেম দ্রুত বিশৃঙ্খলার দিকে যায়। কাজ, ক্যারিয়ার, অর্থ—এসব আসলে জীবনের জৈবিক প্রয়োজনের সামাজিক রূপ।
অনেক মানুষ বলে তারা জীবনের অর্থ খোঁজে। কিন্তু বাস্তবে মানুষ অর্থের চেয়ে ব্যস্ততা বেশি চায়। কাজ না থাকলে মানুষ ভেঙে পড়ে, হতাশ হয়, মানসিক সমস্যায় পড়ে। তাই অর্থ বা meaning অনেক সময় কোনো মহাজাগতিক সত্য না, বরং মস্তিষ্কের তৈরি একটি কাহিনি—যেটা না থাকলে মানুষ টিকে থাকতে পারে না।
এই দৃষ্টিতে মানুষ আর আগুনের মধ্যে পার্থক্য খুব বেশি না। আগুন কাঠ খায়, মানুষ খাবার খায়। দুজনেই শক্তি রূপান্তর করে, তাপ ছাড়ে, বর্জ্য তৈরি করে এবং একসময় নিভে যায়। পার্থক্য এক জায়গায়—মানুষ জানে যে সে একদিন নিভে যাবে। এই জানাটাই মানুষকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে।

Comments
Post a Comment